২০২৪ সালে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একটি সাক্ষাৎকারে দেশটির ব্যাংক খাত থেকে বিশাল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ উত্থাপন করেন। এই অর্থ সরানোর জন্য ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও দেশটির একটি গোয়েন্দা সংস্থার কিছু সদস্যকে দায়ী করা হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে মনসুর জানান, এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তার সহযোগীরা অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যাংক থেকে সরিয়েছেন। এসব অভিযোগ বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ব্যাংক দখলের পদ্ধতি ও তহবিল পাচারের কৌশল
গভর্নর মনসুর বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (ডিজিএফআই) সহযোগিতায় কিছু ব্যাংকের দখল নেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মিলে ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগ করে তাদের শেয়ার বিক্রি করাতে বাধ্য করে এবং পরিচালনা পদ থেকে পদত্যাগ করায়। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ও তার সহযোগীরা প্রতিদিন নিজেদের জন্য নতুন ঋণ মঞ্জুর করে ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়েছেন এবং এসব টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে কুইন এমানুয়েল আরকুহার্ট অ্যান্ড সুলিভান নামে একটি আইনি প্রতিষ্ঠান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, অভিযোগের ভিত্তি নেই এবং এটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা।
অর্থ চুরি এবং পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ
গভর্নর মনসুর বলেন, দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার এবং ব্যাংক খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের সহায়তা নেওয়া হবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা করছে, যা ব্যাংকের অসুস্থ সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তি করবে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংক খাতের উপর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছে। মনসুরের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে দখল করা ১২টি ব্যাংকের নিরীক্ষা করা হবে এবং এ নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেশে ও বিদেশের আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া এবং সরকারের পরিকল্পনা
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যের সহায়তা চান। এতে শেখ হাসিনার সহযোগীদের বিদেশে থাকা সম্পদের তদন্ত সহজতর হবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ব্যাংক শেয়ার বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা জানান, শেখ হাসিনার শাসনামলে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণে একাধিক ধরনের অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ব্যাংকের মিথ্যা কাগজপত্র তৈরি এবং পরিচালকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর ঘটনা অন্তর্ভুক্ত।
এই পুরো ঘটনার ফলে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে এবং নৈতিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা জোরদার হয়েছে।

.png)
.png)